তথ্যগত ভুল সংশোধনের পর আবারো দেশের রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে সৌদি আরব। আর গত কয়েক বছর শীর্ষস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেমে গেছে পঞ্চম স্থানে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের এপ্রিলের পর টানা তিন মাস কমেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রবাসী আয়। বিপরীতে বেড়েছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এতদিন দেশের রেমিট্যান্সের উৎস দেশের তথ্যে বড় ধরনের ভুল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন রেমিট্যান্স হাউজগুলোর মাধ্যমে আসা প্রবাসী আয় ওইসব দেশের হিসাবে দেখানো হচ্ছিল। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল থেকে উৎস দেশের রিপোর্টিংয়ে সংশোধন আনা হয়েছে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের রেমিট্যান্স অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিপরীতে সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্স দ্বিগুণ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্সের উৎস নিয়ে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে বণিক বার্তা। ‘মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ; রেমিট্যান্সের বাজারে অলিগোপলি তৈরি করেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্সের বড় অংশই দেশটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের পাঠানো নয়। বরং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশীর পাঠানো রেমিট্যান্সও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেখানো হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও বাংলাদেশে ঢুকছে যুক্তরাষ্ট্রের রেমিট্যান্স হিসেবে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন গেটওয়েগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে দেশটিতে নিয়ে যেত, এরপর সেটি পাঠানো হতো বাংলাদেশে। ফলে দেশের ব্যাংকগুলো সেটিকে নথিভুক্ত করত যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে। মূলত বাংলাদেশী রেমিট্যান্সের বাজার থেকে মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নসহ মার্কিন বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ ও অ্যাগ্রিগেটরের (যেসব বড় প্রতিষ্ঠান অন্যান্য ছোট এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে রেমিট্যান্স বা আন্তঃদেশীয় লেনদেনের অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে একত্র করে) সংগৃহীত রেমিট্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেখানোর কারণেই পরিসংখ্যানে বড় ধরনের গড়বড় দেখা দিয়েছে।’
বণিক বার্তায় এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেমিট্যান্সের উৎস দেশের তথ্য সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নসহ যুক্তরাষ্ট্রের রেমিট্যান্স হাউজগুলো মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করে দেশটিতে নিয়ে যেত। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের গেটওয়ে ব্যবহার করে বাংলাদেশে পাঠাত। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্সও যুক্তরাষ্ট্রের বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা রিপোর্টিং প্রক্রিয়ায় সংশোধন এনেছি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাম তালিকার নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।’
রেমিট্যান্স হাউজগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছতা আনার নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। এ তথ্য জানিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তদারকিও করা হচ্ছে। আগামীতে রেমিট্যান্সের উৎস দেশের তথ্যে আরো স্বচ্ছতা আসবে। তখন হয়তো দেখা যাবে, যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ দশের মধ্যেও নেই।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, উৎস দেশের তথ্য সংশোধনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্স অর্ধেকের বেশি কমেছে। চলতি বছরের মার্চে দেশটি থেকে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার। এর পরের মাস থেকেই তা কমতে থাকে। এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্স নেমে আসে ৩৩ কোটি ৮ লাখ ডলারে। এরপর মে মাসে ২২ কোটি ৩৭ লাখ এবং জুনে ২৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশটি থেকে। অন্যদিকে একই সময়ে বেড়েছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহ।
রেমিট্যান্সের উৎস দেশের তথ্য সংশোধনের পর দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব আবারো শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক তথা এপ্রিল থেকে জুন—এ তিন মাস মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে এসেছে ১৪৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১০৪ কোটি ৭৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আর তৃতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ১০০ কোটি ৩১ লাখ ডলার। চতুর্থ স্থানে ছিল মালয়েশিয়ার নাম, যেখান থেকে এসেছে ৯১ কোটি ডলার। আর গত কয়েক বছর শীর্ষস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে মাত্র ৭৯ কোটি ২৭ লাখ ডলার।
ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা রেমিট্যান্স আরো অনেক কমে যাবে। কারণ এ তিনটি দেশের রেমিট্যান্স হাউজগুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। পরে তা দরকষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করছে। আর ব্যাংকগুলো যে দেশের রেমিট্যান্স হাউজ থেকে ডলার কিনছে, সেটিকে ওই দেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স হিসেবে দেখাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স বেশি দেখানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা মাস্টারকার্ডের। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড নেটওয়ার্কের জন্য বিখ্যাত এ মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক রেমিট্যান্সের বাজারেরও জায়ান্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ট্রান্সফার্স্ট অধিগ্রহণের মাধ্যমে রেমিট্যান্সের বাজারে প্রবেশ করে মাস্টারকার্ড। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির আন্তঃদেশীয় রেমিট্যান্স ব্যবসা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের ২১০টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশেও রেমিট্যান্স আসার বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে মাস্টারকার্ড। ফলে তাদের অংশীদারত্ব যত বাড়ছিল, ঠিক ততটাই উল্লম্ফন ঘটছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্সে।
বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মাস্টারকার্ড নয়, বরং তথ্যের বিভ্রান্তিটি ছিল ব্যাংকের দিক থেকে। কোনো কোনো ব্যাংক মাস্টারকার্ডের কাছ থেকে কেনা রেমিট্যান্স যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা হিসাবে দেখাচ্ছিল। যদিও সে অর্থ হয়তো ১৬০-১৭০টি দেশ থেকে সংগ্রহ করেছে মাস্টারকার্ড। কারণ বিশ্বব্যাপীই আমাদের কার্যক্রম রয়েছে। আমরাই বাংলাদেশ ব্যাংককে বলেছিলাম, ব্যাংকগুলোকে যেন রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার নির্দেশনা দেয়া হয়।’